1969 খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের বিভাজনের প্রধান কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।
উত্তরঃ প্রেক্ষাপট: 1969 খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেস দলের বিভাজন ঘটে। কিন্তু এর প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল 1967 খ্রিস্টাব্দে সাধারণ নির্বাচনের সময় থেকেই।
1967 খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের সময়ে দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। দু-বছরের মধ্যে দুজন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু এবং রীতিমতো লড়াই করে, ভারতীয় রাজনীতির নতুন অনভিজ্ঞ সদস্যা নেহরু কন্যা ইন্দিরা গান্ধির রাজনৈতিক আগমন তথা প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় পদার্পণ ভারতীয় রাজনীতির পালা বদলের সূচনা করে। ইন্দিরা গান্ধির প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়ার সময়কালে ভারতীয় রাজনীতি বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। খরা, খাদ্যসংকট, রফতানিতে পতন, বিদেশি মুদ্রার মজুত হ্রাস, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বরাদ্দকৃত পরিকল্পিত অর্থকে যুদ্ধের কারণে সামরিক খাতে ব্যয় প্রভৃতি কারণে ভারতীয় সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি সংকটাকীর্ণ, ঠিক তখনই ইন্দিরা গান্ধির ভারতীয় মুদ্রার মূল্য হ্রাসের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এমনই কিছু ঘটনা পরম্পরা কংগ্রেসের ভাঙনের প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল যা এর দু-বছর পর 1969 খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়। সংক্ষেপে এর কারণগুলি হল নিম্নরূপ :
• কারণ :
[i] ভারতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেনের মৃত্যুর পর সে-বছর রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়ে পড়ে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইন্দিরা গান্ধি এবং সিন্ডিকেট গোষ্ঠীর মধ্যেকার মতপার্থক্যজনিত বিবাদ 1969 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ্যে চলে আসে।
[ii] মিসেস গান্ধির আপত্তি সত্ত্বেও সিন্ডিকেট গোষ্ঠী তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধী তথা সে-সময়ের লোকসভার অধ্যক্ষ এন সঞ্জীব রেড্ডিকে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেসের দলীয় নির্বাচনি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে সক্ষম হয়। প্রতিশোধ হিসেবে ইন্দিরা গান্ধি তখন সেই সময়ে উপরাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়ার ব্যাপারে রাজি করাতে সমর্থ হন।
[iii] তৎকালীন সময়ের কংগ্রেস দলের সভাপতি এস নিজালিংগাপ্পা 'হুইপ' জারি করে দলের সকল সাংসদ ও বিধানসভার বিধায়কদের দলীয় প্রার্থী সঞ্জীব রেড্ডির পক্ষে ভোট প্রদান করার নির্দেশ দেন।
[iv] ওই সময় ইন্দিরা গান্ধির সমর্থক গোষ্ঠী এ আই সি সি (AICC)-এর বিশেষ অধিবেশন ডাকার জন্য বিধি অনুসারে অনুরোধ করেন, কিন্তু এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়। ভি ভি গিরিকে গোপনে সমর্থন করার পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি সকলকে বিবেক ভোট প্রদান করার জন্য আবেদন করেন। এর অর্থ ছিল সাংসদ এবং বিধানসভার সদস্যরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী ভোট প্রদান করতে পারবেন।
[v] নির্বাচনি ফলাফলে দেখা যায়, কংগ্রেসের দলীয় প্রার্থী সঞ্জীব রেড্ডিকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভি ভি গিরিই জয়লাভ করেন।
দলীয় প্রার্থীর এহেন পরাজয়ের ফলে কংগ্রেস দলে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দেয়। দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধি দাবি করেন যে, তার সমর্থিত দলই প্রকৃত কংগ্রেস। 1969 খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে সিন্ডিকেট পরিচালিত গোষ্ঠী কংগ্রেস (অরগানাইজেশন) এবং ইন্দিরা গান্ধি পরিচালিত গোষ্ঠী কংগ্রেস (রিকুইজিশনিস্ট) নামে পরিচিতি লাভ করে। এই দুই গোষ্ঠী যথাক্রমে পুরোনো কংগ্রেস ও নতুন কংগ্রেস নামেও সমধিক জনপ্রিয় হয়। ইন্দিরা গান্ধি এই বিভাজনকে সমাজতন্ত্রবাদী ও সংরক্ষণশীলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তা ছাড়া তিনি এই বিভাজনকে দরিদ্রমুখী এবং বিত্তশালীমুখী হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন